সাংবাদিকতা নিঃসন্দেহে একটি মহৎ ও দায়িত্বশীল পেশা। সমাজের অসংগতি তুলে ধরা, মানুষের অধিকার ও দুর্ভোগের কথা বলা, অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করা এবং সত্যকে মানুষের সামনে তুলে ধরাই সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। একজন প্রকৃত সাংবাদিক সমাজের দর্পণ হিসেবে কাজ করেন। তাই সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের আস্থা, বিশ্বাস ও প্রত্যাশা।
কিন্তু কালের পরিক্রমায় এই মহৎ পেশাটিই বর্তমানে নানা কারণে কলুষিত হচ্ছে। এর অন্যতম কারণ হলো মূলধারার প্রকৃত সাংবাদিকের তুলনায় ভুয়া ও অপসাংবাদিকের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়া। আর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে প্রকৃত সাংবাদিকদের ওপরও। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত সাংবাদিকদের নিজেদের পেশাগত পরিচয় দিতেও বিব্রত হতে হচ্ছে।
কয়েক দশক আগে সংবাদপত্র জগতের দিকে তাকালে সাংবাদিকতার এক ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। তখন সাংবাদিকতা ছিল অনেক বেশি কষ্টসাধ্য ও শ্রমনির্ভর।
একজন সাংবাদিক কোনো ঘটনা বা সংবাদ সংগ্রহ করার পর সেটি কাগজে-কলমে লিখতেন। এরপর স্থানীয় পত্রিকা হলে নিজে বার্তাকক্ষে গিয়ে সংবাদ জমা দিতেন। আর জাতীয় দৈনিকের ক্ষেত্রে টেলিফোন, টেলিগ্রাম এবং ফ্যাক্সের মাধ্যমে সংবাদ পাঠাতে হতো।
এখনকার মতো মোটরবাইকে করে ছোটার সামর্থ্য অনেক সংবাদকর্মীর ছিল না। সংবাদ সংগ্রহে বাইসাইকেল, ভ্যান-রিকশা এবং দূরের পথ হলে বেবিট্যাক্সি বা বাসে করে যেতে হতো। মোটরবাইক যে একেবারেই ছিল না তা নয়। একটি জেলা শহরে দেখা গেল হাতে গোনা দু-চার জনের মোটরবাইক ব্যবহার করতেন।
তবে সেই সময়ের সাংবাদিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল অন্যের সংবাদ কপি করে নিজের নামে পাঠিয়ে দেওয়ার সুযোগ ছিল না। কোনো সাংবাদিক তার সহকর্মীর কাছ থেকে তথ্যের সহযোগিতা নিতে পারতেন, কিন্তু সংবাদটি তাকে নিজের হাতেই লিখতে হতো।
একজন সাংবাদিকের লেখা সংবাদ আরেকজন সাংবাদিক হুবহু কপি করে নিজের পত্রিকায় পাঠিয়ে দেওয়ার সুযোগ ছিল না। প্রতিটি পত্রিকা অফিসে একজন সাংবাদিকের ব্যক্তি পরিচয়ের পাশাপাশি তার লেখনীরও একটি আলাদা পরিচয় ছিল।
তার হাতের লেখা কেমন, সংবাদ লেখার ধরন কেমন, তথ্য উপস্থাপনের দক্ষতা কেমন এসব বিষয়ও ছিল সাংবাদিকের পরিচয়ের অংশ। অর্থাৎ, সে সময় একজন সাংবাদিকের প্রকৃত পরিচয় ছিল তার সংবাদ লেখার কৌশল, মেধা, দক্ষতা ও পেশাগত সততা।
সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। ডিজিটাল যুগে এসে সংবাদ পাঠানোর সেই কষ্টকর দিন আর নেই। এখন দেশের যেকোনো প্রান্তে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা মুহূর্তের মধ্যে স্থানীয়, জাতীয় এমনকি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
একটি ঘটনা ঘটার পর কে সবার আগে সংবাদ পাঠাবে, কোন সংবাদমাধ্যম আগে প্রকাশ করবে— এ নিয়ে এখন চলছে ব্যাপক প্রতিযোগিতা।
প্রিন্ট মিডিয়ার সংবাদপত্র পাঠকের কাছে পৌঁছানোর আগেই অনলাইন সংবাদমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়ে যাচ্ছে। সেই সংবাদ আবার মুহূর্তের মধ্যে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে পাঠক খুব দ্রুত সংবাদ জানতে পারছেন। তথ্যপ্রবাহের ক্ষেত্রে এটি নিঃসন্দেহে প্রযুক্তির একটি বড় সুবিধা। কিন্তু এই সুবিধার পাশাপাশি তৈরি হয়েছে নতুন কিছু সমস্যা।
বর্তমানে অনেকেই অন্য কোনো গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ কপি করে নিজের ফেসবুক আইডি, পেজ কিংবা অন্য কোনো প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করছেন। ফলে যে ব্যক্তি সংবাদ সংগ্রহ করেননি, তথ্য যাচাই করেননি, সংবাদ লেখার কোনো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাননি— তিনিও মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
নামসর্বস্ব কিছু পত্রিকা এবং রেজিস্ট্রেশনবিহীন অনলাইন পোর্টাল এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে। এমন কিছু পত্রিকা রয়েছে যেগুলো প্রতিদিন নিয়মিত প্রকাশিত হয় না। আবার কোনো কোনো পত্রিকা ছাপা হলেও অফিস কপির বাইরে তেমন কোনো প্রচার বা পাঠক পর্যায়ে পৌঁছানোর কার্যক্রম দেখা যায় না। এসব নামসর্বস্ব পত্রিকা এবং রেজিস্ট্রেশনবিহীন অনলাইন পোর্টালের কেউ কেউ নিজেদের স্বার্থে অর্থের বিনিময়ে সাংবাদিক তৈরি করছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এমনও কিছু সংবাদ পোর্টালের সম্পাদক রয়েছেন যারা নিজেরাই সংবাদ লেখার কৌশল জানেন না। সাংবাদিকতার নীতি-আদর্শ জানা থাকুক বা না থাকুক, সংবাদ লেখার কলা-কৌশল জানা থাকুক বা না থাকুক নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দিলেই দেওয়া হচ্ছে সাংবাদিকের পরিচয়পত্র।
ফলে সাংবাদিকতার সঙ্গে যার কোনো বাস্তব সম্পর্ক নেই, তিনিও একটি আইডেন্টিটি কার্ড হাতে নিয়ে সাংবাদিক পরিচয়ে বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ পাচ্ছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি নতুন প্রবণতা তৈরি হয়েছে। পত্রিকার নামের আদলে ফেসবুক পেজ খুলে অনেকেই রাতারাতি সাংবাদিক হয়ে যাচ্ছেন।
কোনো ঘটনা ঘটলে কেউ কেউ ফেসবুকে ভিডিও প্রকাশ এবং লাইভ করছেন, কেউ অন্যের সংবাদ নিজের পেজে প্রচার করছেন। কখনো কখনো বৈধ টেলিভিশন চ্যানেল বা সংবাদমাধ্যমে সংবাদ প্রচারের আগেই ফেসবুকে সংবাদ দিয়ে বাহবা কুড়াচ্ছেন এইসব কথিত ফেসবুক সাংবাদিকরা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংবাদ বা তথ্য প্রকাশ করা অপরাধ নয়। বরং দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করলে এটি তথ্যপ্রবাহকে আরও দ্রুত ও কার্যকর করতে পারে। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন ফেসবুক লাইভকে সাংবাদিকতার একমাত্র পরিচয় হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
সাংবাদিকতার নীতি-আদর্শ বা পেশাগত আচরণ সম্পর্কে কোনো ধারণা না থাকায় এসব তথাকথিত ফেসবুক সাংবাদিকরা বিভিন্ন স্থানে নানা ধরনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন।
একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া জরুরি ফেসবুকে সংবাদ সংক্রান্ত পোস্ট দিলেই কেউ সাংবাদিক হয়ে যান না।
কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত ভিডিও, পোস্ট বা সংবাদধর্মী কনটেন্ট তৈরি করলে তিনি কনটেন্ট ক্রিয়েটর হতে পারেন। কিন্তু সেটিকে কোনোভাবেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাংবাদিকতা বলা যায় না।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে কয়েক ধরনের সংবাদকর্মী বা সংবাদ পরিবেশনকারী দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে টিভি চ্যানেলের সাংবাদিক, প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিক, অনলাইন পোর্টালের সাংবাদিক এবং ফেসবুক সাংবাদিক। এদের মধ্যে কে বৈধ সাংবাদিক, কে প্রকৃত সংবাদকর্মী এবং কে কেবল সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করছেন— সেটি একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
ডিজিটাল যুগ আমাদের সংবাদ সংগ্রহ ও তথ্যপ্রবাহকে অভাবনীয় সহজ করে দিয়েছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে একটি সংবাদ দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে। পাঠকও দ্রুত জানতে পারছেন কোথায় কী ঘটছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রযুক্তি ভুয়া ও অপসাংবাদিকতার বিস্তারের সুযোগও তৈরি করেছে।
ইতোমধ্যে খুলনা প্রেসক্লাবের উদ্যোগে ভুয়া ও অপসাংবাদিকতা রোধে জেলা প্রশাসকের বরাবর লিখিত আবেদন করা হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
এখন প্রশ্ন হলো জেলা প্রশাসন কিংবা সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো এই আবেদন কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখবে এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেবে? কারণ অতীতে নির্বাচনকালীন সময়ে সাংবাদিকদের মিডিয়া পাস প্রদানের ক্ষেত্রে দেখা গেছে প্রকৃত সাংবাদিকদের পাশাপাশি অনেক সময় ভুয়া বা অপসাংবাদিকরাও সুযোগ পেয়ে থাকে।
তবে খুলনা প্রেসক্লাবের আবেদন গুরুত্বসহকারে আমলে নিয়ে ভুয়া ও অপসাংবাদিকতা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
একজন প্রকৃত সাংবাদিকের পরিচয় তার পত্রিকা বা গণমাধ্যম। ফেসবুকে সংবাদ-সংক্রান্ত পোস্ট দিলেই তিনি সাংবাদিক হয়ে যেতে পারেন না। একইভাবে একটি পরিচয়পত্র হাতে থাকলেই সাংবাদিকতার সব যোগ্যতা অর্জন করা যায় না।
সাংবাদিকতা একটি দায়িত্বশীল পেশা। এখানে সত্যতা, নিরপেক্ষতা, তথ্য যাচাই, পেশাগত সততা এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সেকালে প্রযুক্তির অভাব ছিল, কিন্তু সাংবাদিকতার প্রতি পেশাগত নিষ্ঠা ও দায়বদ্ধতা ছিল। এখন প্রযুক্তির অভাব নেই, সংবাদ প্রকাশের গতি অভাবনীয়; কিন্তু সেই গতি যেন সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতাকে ছাপিয়ে না যায়।
আমরা চাই না সাংবাদিকতার মতো একটি মহৎ পেশা কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে মানুষের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হোক। আমরা চাই, এই পেশায় মহান, সৎ, দক্ষ ও দায়িত্বশীল মানুষেরাই কাজ করুন। ভুয়া ও অপসাংবাদিকতার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। প্রকৃত সাংবাদিকদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক। সাধারণ মানুষের বিভ্রান্তি দূর করতে সাংবাদিকতার প্রকৃত পরিচয় ও বৈধতার বিষয়টি স্পষ্ট করা হোক।
খুলনা গেজেট/এনএম

